সাংখ্যের ২৫ তত্ত্ব ১৯৯৯ র ১৪ই সেপ্টেম্বর টাইমস অফ ইন্ডিয়ার একটা ছোট্ট খবরে আমি একই সঙ্গে খুব পুলকিত আর দুঃখিত হয়েছিলাম। আনন্দ হয়েছিল কারণ খবরটা হচ্ছে আয়ারল্যান্ড এর একটা ক্যাথলিক স্কুলে সংস্ক বৈদিক গণিত ঋক বেদ আর মহাকাব্য পড়ানো হচ্ছে। মুম্বাইতে কেউ টিভি চ্যানেলে দেখতে পেয়ে খবর টা দিয়েছেন। সেখানে প্রিন্সিপাল আর শিক্ষকবৃন্দ সবাই আইরিশ। সবাই বিষয় গুলোকে গভীর ভাবে শ্রদ্ধা করেছেন। প্রিন্সিপাল বলেছিলেন বাস্তববাদী বুদ্ধি নিয়ে পশ্চিমের জগৎ পথভ্রষ্ট হচ্ছে। ভারতীয় মূল্যবোধ এবং প্রজ্ঞার কাছে পশ্চিমের এখনো অনেক কিছু শিখবার আছে।

আনন্দ হয়েছিল কারণ ভারত বর্ষের মূল্যবোধ কোনো জাতিগত সম্প্রদায় গত বা কোনো বিশেষ ভূখণ্ড গত কল্যাণের সূচনা করেনি শুধু , ভারতীয় প্রজ্ঞা জীব জগতের তথা বিশ্ব জগতের ভাবনা মঙ্গলময় সূত্রে আবদ্ধ করেছে, অনেক বিচার আর বিভিন্নমূখি চিন্তা ধারার সমন্বয় ঘটিয়ে।

দুঃখ হলো এই জন্য এই প্রজ্ঞা- নিজেদের পৈত্রিক সম্পত্তি এই প্রজ্ঞা, জনজীবন থেকে অনেক দূরে সরে গেছে। শুধু তাই নয় ,যারা মানুষ কে উৎসাহিত করে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবেন, রাজ্যের সেই মুখ্য কর্ণ ধারক বলে বসেন “সংস্কৃত শিখে কি পুরোহিত হবে?” - হায় মূর্খতা।

আসলে একটা ভয়ের আর অবজ্ঞার বাতাবরণ তৈরি হয়েছিল সংস্কৃত শিক্ষার বিরুদ্ধে। সংস্কৃত শিখলে রোজগার করা যাবেনা -দরিদ্র হয়েই থাকতে হবে। সেই মেকলের সময়ের শিক্ষা ৮০-৮২ বছর পরেও স্বাধীন ভারত ভুলতে পারেনি। বিজ্ঞান মুখী যাত্রায় যে ছাত্র সমাজ আজকের দিনে উৎসুক আনন্দ নিয়ে এগিয়ে চলেছে, তাদের ভিত্তিতে কিছু সংস্কৃত ত্বাত্তিক জ্ঞানের পরিচয় যদি থাকতো, তবে তারা যে পুলকিত হতো এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে স্বস্থ হতে পারতো।

যতই বিরুদ্ধ প্রচার করা হয়ে থাকুক না কেন, ছয় দর্শন কিন্তু কোনো অলীক কথা বলেনি। বৈশেষিক পদার্থ বিচার করেছে, সেই তত্ত্ব গুলি প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রমান নিয়ে আলোচনা করেছেন প্রাচীন ন্যায়-

একথা মনে রাখতে হবে যে আধুনিক বিজ্ঞান consciousness বিষয়ক গবেষণায় উদ্বেল। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর দ্বিতীয় পর্যায় সেদিকে ছুটে চলেছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা এটা জানতে পারছেনা - এটাই দুঃখ।
http://www.bbc.com/earth/story/20170215-the-strange-link-between-the-human-mind-and-quantum-physics

সাংখ্য বলেছেন “ব্যক্ত” “অব্যক্ত” আর “জ্ঞ” জানলে আর দুঃখ থাকবেনা। কথাটা একটু অদ্ভুত ভাবে এসেছিলো।

কপিলমুনি অনেক তপস্যা করে যখন দুঃখের পার দেখতে পেয়েছিলেন তখন মানুষের কাছে সেই বার্তা পৌঁছাতে চেয়েছিলেন

লোকালয় এসে সজ্জন আসুরির কাছে বলেছিলেন তুমি সংসারে সুখ ভোগ করে ভালো আছো তো?

আসুরি আনন্দিত চিত্তে বললেন - হ্যাঁ , ভালোই তো আছি। “রমে ভো !” -মুনি চলে গেলেন - যার মনে জিজ্ঞাসা জাগেনি - যার মনে চারিদিকে তাকিয়ে কোনো ব্যাথা বোধ হয়না - তাকে কি আর বলা যায়।

তাহলেও লোক কল্যান ব্রতী মুনি ফিরে ফিরে দু’তিনবার বার এসে ছিলেন। জিজ্ঞাসা করেছিলেন ,ভালো আছোতো?

আসুরি ভালই ছিলেন। তাই বললেন “রমে ভো !” । একবার কপিল মুনি এসে শুনলেন আসুরি ভালো নেই। ভালো না থাকার কারণ থাকে তো - কেন ভালো থাকছিনা এই জিজ্ঞাসা আছে।

আসুরি কপিল মুনির শরণ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন।

“দুঃখ ত্রয়াভিঘাতাতজিজ্ঞাসা” ।

এটা সাংখ্যর প্রথম শ্লোক। দুঃখ ত্রয় বলা হলো কেন ?

তিন রকম দুঃখ দেখে আসুরির জিজ্ঞাসা তৈরি হয়েছিল।

আধ্যাত্মিক আধিভৌতিক এবং আধিদৈবিক। কথা গুলো শুনতে ভারী লাগছে ? আসলে কিন্তু মোটেই ভারী নয়।

শরীর এবং মন কে যা অধিকার করে থাকে তাই আধ্যাত্মিক -আত্মা শরীর এবং মন এই দুই ভাবে বিভক্ত - প্রিয় বিচ্ছেদ আর অপ্রিয় সংযোগ হলো মানসিক দুঃখ - রোগ জরা দুর্ঘটনা এগুলো শারীরিক দুঃখ।

আধিভৌতিক মানে ভিন্ন কোনো প্রাণী দিয়ে আক্রান্ত হওয়া। এটা মশা কামড় ও হতে পারে।

আধিদৈবিক মানে ঝড় ঝঞ্ঝা ভূমিকম্প এসব বিপর্যয়।

বলা যেতে পারে এর মধ্যে জিজ্ঞাসার আর কি আছে - এগুলোর সব কটার প্রতিকার আছে। অসুখ হলে ডাক্তার দেখাতে হবে -প্রাণী দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সেটা নিরাকরণ , দরজা বন্ধ করে , বেড়া দিয়ে ঘিরে অথবা আগুন জ্বেলে করতে হবে। কিন্তু ওষুধ তো কাজ নাও করতে পারে, ডাক্তার যথাযথ নাও হতে পারে। একবার সেরে গেলেও রোগ হতে পারে। সম্পূর্ণ নিরাময় চাই। সেটা হয় মুশকিল। কারণ যতদূর দেখা গেছে, প্রত্যক্ষ্য আর বেদ বিহিত কর্মকান্ড যাগ যজ্ঞাদি যা কিছু সবই দোষযুক্ত আর তারতম্য যুক্ত। তবে উপায় একটা আছে। যদি “ব্যক্ত” ,“অব্যক্ত” আর “জ্ঞ” কে জানতে পারো তাহলে আর দুঃখ থাকবেনা। কোনো কিছুই কে না জানাই দুঃখ, জানলে আর দুঃখ থাকেনা। গীতা বলেছেন

জ্ঞানী শোকমুক্ত হন। “জ্ঞ” বা চৈতন্যময় পুরুষ মানুষ কে পথপ্রদর্শন করেন। কিন্তু “ব্যক্ত” ,“অব্যক্ত” আর “জ্ঞ” কথাগুলি খুব শক্ত মনে হচ্ছে নাকি?

না শক্ত নয় - “ব্যক্ত” মানে আমাদের চেনা, প্রকৃতির সৃষ্ট পৃথিবী- “অব্যক্ত” মানে প্রকৃতি আর “জ্ঞ” মানে আপ্তপুরুষ বা চৈতন্যময় পুরুষ। কথাটাকে ২৫ তত্ত্বের বিবরণ দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন সাংখ্য। ২৫ তত্ত্ব কি কি সেটা জানতে হবে।

আমরা অহংকার মানে বুঝি দাম্ভিকতা , এখানে কিন্তু অহঙ্কার মানে শরীর। অ থেকে হ পর্যন্ত স্পন্দনাত্মক বর্ণমালা দিয়ে শরীর গঠিত হয়। বর্ণের জন্য কার প্রত্যয় হয়। যেমন অ-কার ই-কার উ -কার সেরকম অহংকার। বর্ণ গুলি কিভাবে শরীরে অবস্থান করে সেকথা তন্ত্র শাস্ত্রে বিবেচনা করা হয়েছে। আর মহৎ তত্ত্ব কে বুদ্ধি তত্ত্ব বলা যায়। ২৩ তত্ত্বের সাথে আর অন্য দুটি হলো “অব্যক্ত” আর “জ্ঞ”। “অব্যক্ত” আর “জ্ঞ”কে অথবা প্রকৃতি আর চৈতন্য পুরুষ কে আমরা দেখতে পাইনা। যা দেখতে পাইনা তাকে মানবো কেন?

এই নিয়ে অনেক বিচার বিতন্ডা হয়েছে - এখনো হয়। পঞ্চভূত থেকে মহৎ মানে বুদ্ধি পর্যন্ত কথা গুলো আমরা বুঝেছি - প্রত্যক্ষ প্রমান দিয়ে। ক্ষিতি ,অপ ,তেজ ,মরুত, ব্যোম এগুলি প্রত্যক্ষ বস্তু। আমাদের যন্ত্রপাতি আর বুদ্ধি দিয়ে প্রত্যেকটি স্বরূপ উদ্ঘাটন করা সম্ভব। বায়োলজি কেমিস্ট্রি জীবকে তন্ন তন্ন করে জানার চেষ্টা করেছে - প্রাচীনরাও করেছিলেন তাদের পদ্ধতিতে।

সাইকোলজি আর নিউরোসায়েন্স, বুদ্ধি আর মনকে মাপতে চেষ্টা করেছে। এগুলি নিয়ে ই আমাদের অস্তিত্ব। কিন্তু অব্যক্ত আর জ্ঞ , মানে ,প্রকৃতি আর জ্ঞানময় চৈতন্য স্বরূপ, কে কিভাবে জানব ?

সাংখ্যকার বললেন কোন বিষয়ে বুঝবার জন্য তিন রকম প্রমান আছে। প্রত্যক্ষ, অনুমান আর আপ্তবচন। এক মানদণ্ড দিয়ে আমরা সব পরিমাপ করিনা। শাড়ি চাল আর জমি আর জল এদের পরিমাপের ব্যাবস্থাগুলি আলাদাই হয়ে থাকে।

কিন্তু সাংখ্যকার যে বললেন তিনটে প্রমান - এই নিয়ে মতভেদ আছে। আট রকম পর্যন্ত হিসেবে পাওয়া যায়। সাংখ্যাচার্য এই মত গুলি বিচার দিয়ে খণ্ডন করে বলেছেন, তিন রকম প্রমানের মধ্যেই সব এসে যায়।

অনুমান প্রত্যক্ষ জ্ঞানের উপরি নির্ভর করে। ভর্তি জলাশয় অথবা কালোমেঘ দেখে অনুমান করা যায় বৃষ্টি হয়েছিল, অথবা হবে। সমুদ্রের একফোঁটা লবনাক্ত জল দেখে বোঝাযায় যে পুরো সমদ্রের জল-ই লবনাক্ত। পাত্রের একটি চাল সুসিদ্ধ হলে বোঝা যায় পাত্রের সব কত চাল ই সুসিদ্ধ হয়েছে। একটি আমের গাছ মুকুলিত হলে বোঝা যায় সব গাছ ই এখন মুকুলিত হবে কারণ এখন উপযুক্ত ঋতু। সত্ত্ব রজ তম এই তিন ভাবের অধীন হয়ে মহৎতত্ত্ব অথবা বুদ্ধি , সুখ দুঃখ প্রীতি দ্বেষ আনন্দ অবসাদ এই সব গুলি নিয়ে আছে। মহৎ এর এই কার্য থেকে বোঝা যায় প্রকৃতি ত্রিগুণময়ী। মায়ের স্বভাব যেমন সন্তানে বর্তায় তেমন প্রকৃতির থেকে সৃষ্ট বুদ্ধি বা মহৎ তত্ত্বে তার ভাব গুলি অনুস্যূত হয়ে আছে।

প্রকৃতি আবার জড় ধর্মী। সেজন্য প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত সবকিছুই জড় ধর্মী। জড় ধর্মী বস্তুর স্বভাব সে পরার্থ। অর্থাৎ পরের প্রয়োজন সাধন করে। কার প্রয়োজন সাধন করে এই প্রশ্নের উত্তরে পুরুষ বা চৈতন্য স্বরূপের অনুমান করা যায়।

মহদাদিক পরার্থম সংহত্যকারিত্বৎ গৃহাদিবৎ

যেখানে অনেকে একত্র হয়ে কাজ করে সেটা সংহত্যকারি বলে। যেমন বাড়ি জিনিষটা কাউকে আচ্ছাদন দেয়ার জন্য - বাড়িতে রেডিও টিভি আছে কাউকে গান শোনানোর জন্য - রান্না ঘর বা খাবার ঘর কাউকে খাওয়ানোর জন্য - গৃহস্বামী আছেন বলেই এই আয়োজন - তেমনি পুরুষ আছেন বলেই প্রকৃতির কর্মতৎপরতায় তাঁকে পরিপূর্ণ করতে চায়। এই ভাবে পুরুষের অনুমান হয়।

কিন্তু অনুমান দিয়েও সবকিছু বোধগম্য হয়না। স্বর্গ, দেবতা, মহদাদির সৃষ্টিক্রম - এগুলো কোনো অনুমান দিয়ে বোধগম্য হয়না। আপ্ত পুরুষের কাছে জানা যায়। যেমন আপ্তপুরুষ শ্রী রামকৃষ্ণের কাছে বিবেকানন্দ বলেছিলেন -

“আপনি ঈশ্বর কে দেখেছেন ?”

শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছিলেন

“দেখেছি কথাও বলেছি।”

তিনি বিবেকানন্দকে এই অভিজ্ঞতা লাভ করতে সাহায্য করেছিলেন। তাদের বচন বা বলে যাওয়া কথা গুলি কে আগম বলে। সেগুলি অকপট শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিয়ে অনুসরণ করে চললে ঈশ্বর বোধের এই অপূর্ব জ্ঞানের অধিকারী হওয়া যায়।

কার্য কারণ বোধ হলে এবং আপ্ত বচন মেনে চললে দুঃখের অবকাশ থাকেনা। দুঃখের কারণ অজ্ঞানতা। অজ্ঞানতার দুটি শক্তি - আবরণ আর বিচ্ছেদ। অজ্ঞানতা সত্য কে আবৃত করে। এবং মনকে বিভিন্ন আকর্ষণে বহির্মুখী করে রাখে। জ্ঞান অজ্ঞানতা দূর করে - এবং আগম বা আপ্ত বাক্য মনকে সত্য পথ অবলম্বন করতে, চৈতন্য পুরুষকে জানতে সাহায্য করে।

এই ২৫ তত্ত্ব অনেক দিক থেকে অনেক বিচার করে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ৬০ টি বিষয় নিয়ে সাংখ্যে আলোচনা হয়েছে বলে একে ষষ্ঠীতন্ত্র বলা হয় । সেগুলো ভবিষ্যতে আমাদের আলোচনার বিষয় হতে পারে। নিজেদের ঘরের জিনিস জানবার জন্য আমাদের আগ্রহ জাগুক এই প্ৰাৰ্থনা করি।

Bronkhorst, Johannes. 1994. “The Qualities of Sāṅkhya.” Wiener Zeitschrift Für Die Kunde Südasiens/Vienna Journal of South Asian Studies. JSTOR, 309–22.

Davies, John, and others. 1957. The Sankhya Karika of Iswara Krishna: An Exposition of the System of Kapila with Original Sanskrit Texts. Susil Gupta.

Letizia, P. 2017. “HYPOTHESIS: How Defining Nature of Time Might Explain Some of Actual Physics Enigmas.”

Parrott, Rodney J. 1989. “SOTERIOLOGY of Prakṛti: THE World as Guru in Classical Saṃkhya.” Annals of the Bhandarkar Oriental Research Institute 70 (1/4). JSTOR: 65–88.